মো. ফারুক, পেকুয়া;

একসময় পাহাড়ের নির্জন পথ আর অন্ধকার জগতের সঙ্গে যার নাম উচ্চারিত হতো, আজ সেই মানুষটির ঠিকানা একটি ছোট্ট টিনের দোকান। একসময় যাকে ঘিরে ছিল ভয়, আতঙ্ক আর নানা অভিযোগের আলোচনা, এখন তিনি ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বসে থাকেন সামান্য আয়ের আশায়। জীবনের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে ছয় মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করছেন জাহাঙ্গীর আলম।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী গ্রাম। পাহাড়ঘেরা এই জনপদ একসময় নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচিত ছিল। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিও ছিল চ্যালেঞ্জিং। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেই সুযোগে এলাকায় বালু উত্তোলন, গাছ পাচারসহ নানা অনিয়ম চলত।

এই গ্রামেরই বাসিন্দা মৃত জাফর আলমের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম। একসময় বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর পরিচিতি পান ‘বনের রাজা’ নামে। তাঁর ভাই আলমগীরের নামও বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় আসে।

২০১৬ সালে বারবাকিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর আলম। ভালো পথে ফেরার প্রত্যয় নিয়ে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন শুরু করলেও অতীতের মামলা ও নানা বিরোধ তাঁকে ছাড়েনি। একপর্যায়ে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় চার বছর কারাগারে কাটাতে হয় তাঁকে। তাঁর ভাই আলমগীরও টানা সাড়ে ছয় বছর কারাভোগ করেন।

দীর্ঘ কারাবাস শেষে বাইরে ফিরে জাহাঙ্গীরের সামনে অপেক্ষা করছিল কঠিন বাস্তবতা। হাতে ছিল না অর্থ, হারিয়ে গিয়েছিল আগের পরিচিতির সবকিছু। কিন্তু সামনে ছিল স্ত্রী, ছয় মেয়ে ও বৃদ্ধ মায়ের দায়িত্ব।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘জেলে থাকার সময় আমার পরিবার অনেক কষ্ট করেছে। আমার স্ত্রী, ছয় মেয়ে ও মা মানুষের সহযোগিতায় কোনোমতে দিন পার করেছেন। কখনো খাবার জুটেছে, কখনো কষ্টে থাকতে হয়েছে। প্রতিবেশীরা সহযোগিতা না করলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ত।’

কারামুক্তির পর তিনি আর কোনো সংঘাতে না জড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধারদেনা করে বাড়ির সামনে মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করেন ছোট একটি দোকান।

এখন সেই দোকানই তাঁর পরিবারের একমাত্র ভরসা। দোকানের তাকজুড়ে সাজানো সামান্য কিছু পণ্য, সামনে বসার ছোট্ট একটি জায়গা—এটুকুই তাঁর নতুন জীবনের ঠিকানা। কোনো দিন দুই থেকে তিন হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন ক্রেতার দেখা মেলে না। প্রতিদিন আয় হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেই আয় দিয়েই চলে মা, স্ত্রী, ভাই ও ছয় মেয়ের সংসার।

বাড়ির উঠানে লাগানো কলা, জামরুল ও আমড়ার গাছ থেকেও কিছু আয় করেন তিনি। কিন্তু বড় সংসারের খরচ মেটাতে এই সামান্য আয় যথেষ্ট নয়। অর্থের অভাবে এক মেয়ের বিয়ে দিলেও বাকি পাঁচ মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষরা আবারও আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা চক্রান্ত শুরু করেছে। আমি এখন শুধু শান্তিতে বাঁচতে চাই। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। মেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়তে চাই। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে অনেক স্বপ্ন পূরণ করতে পারছি না।’

সরেজমিনে দেখা যায়, একসময়কার আলোচিত এই মানুষটি এখন দোকানের সামনে বসে নীরবে ক্রেতার অপেক্ষা করছেন। নেই আগের দাপট, নেই কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি। আছে শুধু পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ আর নতুন করে বাঁচার আকুতি।

জাহাঙ্গীরের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী মারা গেছেন। দুই ছেলে অনেক বছর পর জেল থেকে বের হয়েছে। এখন তারা শান্তিতে থাকতে চায়। আমরা আর কোনো অশান্তি চাই না।’

স্থানীয় বাসিন্দা রহিম বলেন, ‘মানুষ ভুল করলে পরিবর্তনের সুযোগ দরকার। তারা এখন খুব সাধারণভাবে জীবনযাপন করছে। তাদের পরিবার অনেক কষ্ট করেছে।’

পাহাড়ের অন্ধকার অধ্যায় পেছনে ফেলে জাহাঙ্গীর আলম এখন লড়ছেন অন্য এক যুদ্ধে—বেঁচে থাকার যুদ্ধ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার যুদ্ধ। একসময় যে হাতে ছিল অভিযোগের ভার, আজ সেই হাতেই চলছে ছোট্ট দোকানের হিসাব।

সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনও; তবে সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি।